Latest Feed

Login to Post
রম্য

বোধ বুদ্ধি

@saumenbhattacharjee545
01 Oct 2026

#বোধ_বুদ্ধি


পড়ে গিয়ে হাঁটুতে খুব লাগল। ব্যথা বোধ হল। সে ব্যথা নানা উপচারে চলেও গেল। বোধটা থেকে গেল, যে ব্যথা এরকম হয়।


'বোধবুদ্ধি' শব্দবন্ধটি আকছার ব্যবহার হয়। ব্যবহার হওয়ার সময়ে মনে হয় একই শব্দ বুঝি! তা নয়। একটু উদাহরণ দিই। বাবার মেজাজ খারাপ থাকলে মা আমাদের ভাইবোনদের দিকে তাকিয়ে গাল ফুলিয়ে চোখ বড় বড় করে একটা সিগন্যাল দিতেন... এর অর্থ ছিল বাবার মেজাজ খারাপ। এই সিগন্যালটি আমরা বুঝতাম। এটি বোধ। বাবার মেজাজ যে খারাপ সেটি মা বুঝতেন - তার খানিক অংশ বোধ, খানিক বুদ্ধি। আরেকটি উদাহরণ দিই। সরস্বতী পুজোর বিসর্জনের দিন বাবার নিষেধ না মেনে সিদ্ধি খেয়ে এসে বেশ গুছিয়ে ছড়িয়েছি। বাবাকে এড়িয়ে ঘরে চলে যেতে পারলাম... এটি বোধ। ঘরে যেতে সাহায্য করল বৌদি... এটি বুদ্ধি। বোধ আর বুদ্ধি কিছুতে এক নয় মোটেই।


ক্লাস নাইন। একটি মেয়েকে দেখে ভারি ভাল লাগল। বোধ। ভাল লাগার কথা বলব কিনা সেটা অবশ্য বুদ্ধি দিয়ে ভাবতে হল। এক কথা হল? কিছুতে না। 


 দেখতে গেলে বোধ আর বুদ্ধি একসঙ্গে উচ্চারিত হয়, কিন্তু তারা পরস্পরের প্রায় বিপরীত। বোধ বলে "যাও" , বুদ্ধি বলে "খবরদার যেওনা"। Brain Vs Heart ভাবলে চর্বিতচর্বণ মনে হবে। কিন্তু ব্যাপারটা তা নয় মোটেই। এর মধ্যে কোনো 'versus' নেই।


এই দুইয়ের মধ্যে বরং ভাবই আছে। মেজাজ ভাল থাকলে বুদ্ধি বোধকে বলে "গুরু, একটু চেপে যা না!" উল্টে, আবার বোধ বুদ্ধিকে বলে "তোর বুদ্ধিতে চলছি, পরে ঝামেলা হলে আমাকে দোষ দিবিনা শালা"... দেখতে গেলে সুন্দর যুগলবন্দি! 


কী মজার কথা! তাই না?


মজার নয়। বোধ আর বুদ্ধির কখন যে দোস্তি, কখন মারপিট, সে কথা আম-জাম-কাঁঠাল আদমি বুঝে গেলে ত মুশকিল! তালে ত সব উত্তেজনা, চমক সব শেষ! "আমার এখন মেয়েকে অঙ্ক করাতে ভাল লাগছেনা"," আমার এখন ছেলের সঙ্গে ব্লক বানিয়ে খেলতে ভাল লাগছেনা", সে আমার বোধ। আমার অনুভূতি। আমার বাবার এখন আমার সঙ্গে একটু খেজুরে গপ্পো করতে ইচ্ছে হচ্ছে, অথচ আমি বেজায় ক্লান্ত, একটুও গপ্পো করার ইচ্ছে নেই। সে এক বোধ। কিন্তু তাকে সামলাতে বুদ্ধিকে ডেকে আনব কিনা, নাকি বোধকে জমি ছাড়ব? সেটাও এক বোধ। নাকি বুদ্ধি? গুলিয়ে যায় মাইরি!


আমি বোধকে প্রাধান্য দিই। সে বোধহয় আমার বুদ্ধি কম বলে। বুদ্ধি বড় বাচাল। খুব বকে। বোধ খানিক শান্ত। অনেকে বলবেন হয়ত, যে বুদ্ধির মর্যাদা করেনা তার আর বোধ কী?


তফাৎ আছে বস! 


যার বোধ আছে তার বুদ্ধি নেই এমনটা কম হয়। কিন্তু বুদ্ধিসম্পন্ন বোধহীনের হদিশ পাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। আমার মনে হয়। নেহাত আমারই। 


দুইই থাকুক। পরিমিত ভাবে। কেউ কাউকে ছাপিয়ে না যায়। খেয়াল রাখা ভাল। দিনকাল ভাল না।


সবাই ভাল থাকবেন। বোধ বুদ্ধি নিয়ে।

❤️ 1 💬 0
Read Full Post »
আড্ডা

Wabi-Sabi

@Sharmistha
27 Sep 2026



সমস্যা এলে ব্রক্ষ্মজ্ঞানীর মন টা দার্শনিক হয়ে যায়। আমি ব্রক্ষ্মজ্ঞানী! বাড়ির লোক আমায় আদর করে ব্রক্ষ্মজ্ঞানী বলে। ওরা চাইলেই আমি জগৎ সংসারের বিভিন্ন বিষয়ে গুছিয়ে সুচিন্তিত মতামত দিয়ে থাকি, তাই। দশটি বাক্যে কথা শেষ করা গেলেও অন্তত কুড়িটি বাক্যে শেষ করি, এবং তারপর জিজ্ঞেস করি, বুঝেছ/বুঝেছিস না আরো বলবো? না চাইলে অবশ্য দি না, আমার সময়ের দাম আছে, ভাববেন না ভণিতা করে ‘ছাদ বাগান’ গ্রুপে সদ্য পরিচিত বন্ধুনীর পিসতুতো ভাসুরের মাসতুতো শালীর কথা বলছি। 

যেকথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। সমস্যা এলে ব্রক্ষ্মজ্ঞানীর মনটাও দার্শনিক হয়ে যায়। সোজাসাপটা কথাও একটু টেনে টেনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলি, উদাসীন ‘টোন’এ। কেউ বায়ো চাইলে লিখি 'শান্ত-শিষ্ট ভীতু টাইপের মানুষ, অনেকের মাঝে নেই হয়ে থাকার কৌশল জানি, অন্যের কথা শুনে গোপন রাখতে জানি, আর জানি খেতে।’ এই যেমন এখন বাড়ি খুঁজছি। মনমতো পাচ্ছি না, তাই বলে চিন্তার পাহাড় নিয়ে বসে আছি? একেবারেই না। এই বাড়ি দেখার চক্করে বরং শহরটার গলি ঘুঁজি চেনা হয়ে যাচ্ছে। শুনুন, সমস্যা এলে প্রথমে মনকে পেড়ে ফেলে।‌ মন নিজেই নিজেকে বলে, 'ওহ্, আবার গেরোয় পড়লি?’ একটু থিতু হয়ে আরেকটা মন বলে, ‘তা, এসো বাবা, বসো বাবা, এসেই যখন পড়েছ তখন দুটো দিন থেকেই যাও! আমি সহাবস্থানে বিশ্বাসী!' এবং এই সহাবস্থানের ভাবনা থেকেই এতদিন দিব্যি ঘর করেছি ধূলো-বালি, ঝুল, মাকড়সা, আরশোলা, চেয়ারের ওপর স্তূপীকৃত জামাকাপড়, এভারেস্টের উচ্চতায় পৌঁছে যাওয়া বইএর 'পর বই, কেতরে পড়ে থাকা কুশন, কোঁচকানো সোফার কভার, সেন্টার টেবিলের ওপরে শুয়ে থাকা ব্যাগ-ছাতা-ঝোলা-লোশান এবং প্যারাসিটামল। একে আলস্য বললে বলতেই পারেন আপনারা। কিন্তু ব্রক্ষ্মজ্ঞানীর বয়ানে যদি বলতে হয় তবে আমি এক গর্বিত ল্যাদখোর। সাতচল্লিশ চলে গেল গতহপ্তায়, আর বছর কুড়ি দৌড়লেই ফিতে ছুঁতে পারবো, দেন, টা টা বাই বাই। এ ক'টা বছরের জন্য নিজেকে পাল্টে ফেলা বোকামি। 


ভাবছিলেন সত্যিকারের সমস্যার কথা বলবো? পাগল! সমস্যার কথা বলে পরিবেশ ভারাক্রান্ত করার পক্ষপাতী নই। আমার সব ছুটকো ব্যাপার।

মহাজন বলে গেছেন 'চক্রবৎ পরিবর্তন্তে দুঃখানি চ সুখানি চ', আমি তো দেখি কেবল দুখের পিঠে দুখ! সুখ কই? একটার পর একটা সমস্যা আন-এন্ডিং রিলে রেসের মতো চলছে গত কয়েক বছর, একটা কিছু ঠিকঠাক হলেই আর একজন দৌড়ে আসে হাতেপায়ে লাগাম পরিয়ে দৌড় করাবার জন্য! ওফ! 

যাগ্গে যাক! এসব জীবনের অঙ্গ, ওভারলুক করে এগিয়ে যেতে হবে ফাইনাল ডেস্টিনেশানে। বাবা বলতেন, 'ও ঠিক আছে।' 'ও' মানে 'পরিস্থিতি'। আমির খান বলেছে 'অল ইজ ওয়েল' আর ব্রক্ষ্মজ্ঞানী মেয়েকে বলে 'ধৈর্য ধর, শেষমেশ কিছু ভালোই হবে'। 

ভালোর কথা মনে পড়ায় মনে পড়লো, একটা নভেল পড়েছিলাম, ‘পলিয়ানা’ নামে। অনেকেই জানবেন।‌ বিখ্যাত লেখা। চলচ্চিত্রও আছে। ১৯১৩ সালে এই বইটি লিখেছিলেন‌ Eleanor H Porter. পলিয়ানা একটি ছোট্ট মেয়ে যে অসম্ভব আশাবাদী ছিল। তার প্রিয় খেলা ছিল ‘glad game’. সে সবকিছুর মধ্যেই এমনকি খারাপ কিছু হলেও তার মধ্যে থেকে ভালো কিছু খুঁজে নিতে জানতো। খুব ভালো লেগেছিল নভেলের বিষয়বস্তু। গল্পে পলিয়ানা মেয়েটি চার্চ থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছিল একজোড়া ক্রাচ, সম্ভবত বড়দিনের উপহার ছিল, সে বলেছিল, আই অ্যাম গ্ল্যাড যে এটা আমাকে ব্যবহার করতে হয়না। আমি এতটাই ইনফ্লুয়েন্সড হয়েছিলাম যে এতগুলো বছর পরেও খারাপ কিছু হলে মনের ভেতর থেকে কেউ একজন বলে ওঠে, 'ইটস ওকে। এর চেয়ে খারাপ হতে পারতো!' এবং এই বিশ্বাসটা এতটাই বাড়াবাড়ি রকমের বেশী যে বাবা চলে যাওয়ার পর প্রাথমিক শোক সামলে ওঠার পর মনে হয়েছিল, এটাই ঠিক হলো, বাবা থাকলে আরো কতটা কষ্ট পেতেন! অ্যাডিনো কার্সিনোমার থাবায় বাবা ছ মাসের মধ্যে নেই হয়ে গেলেন! আমি বাবার কাছে ছিলাম না শেষ সময়ে, তখন ভাবিনি হঠাৎ সব শেষ হয়ে যাবে। একঘন্টা আগে পৌঁছে গেলেও বাবা আমাকে দেখতে পারতেন! এত বছর পরে মনে হয়, বাবা কি আমাকে বলে যেতেন কিছু? হয়তো বলতেন, 'মাকে, ভাইকে দেখো…সংসার কোরো মন দিয়ে, বড়দাদাকে মানুষ কোরো'…নাকি বলতেন, 'আমি ভালো হয়ে যাবো, চিন্তা কোরো না' কিংবা কিছুই বলতেন না। বাবার সাথে না কাটানো এই শেষ সময়ের অনেক কাল্পনিক কথোপকথন মাথায় ঘোরে। হয়তো সারাজীবন ফাইট করে জিতে যাওয়া বাবার অসুখের কাছে এই নতজানু সমর্পণ দেখতে চাইনি, যৌবনে ফুটবল খেলা বাবার সুঠাম শরীরের কাঠ হয়ে যাওয়া শরীর মনে রাখতে চাইনি! অথচ বারবার বিদায়বেলার ছবি চোখে ভেসে ওঠে। এইসব ভাবনা পীড়া দেয়। উত্তর না পাওয়ার কষ্ট সাংঘাতিক। ঘুণপোকার মতো কুরে কুরে খায় ভেতরে ভেতরে। যে সব মানুষের সাথে আর কথা হবেনা বা যাদের সাথে আর কথা বলবো না বলে স্থির করা আছে তাদের সাথে নিরন্তর কথা চলে মাথায়। অবশ্য এটা মন্দ নয়, কথোপকথন নিজের ইচ্ছে মতো সাজিয়ে নেওয়া যায় বেশ। আমি জানি সামনের ব্যক্তি কী কী বলতে পারেন আমার প্রশ্নের উত্তরে তবু তার মুখে আমার শুনতে চাওয়া কথা গুলো বসাতে মন্দ লাগে না। ট্রাই ইট সামটাইমস। 


গতকাল একটা জাপানি শব্দ শিখেছি। Wabi-Sabi. Wabi-Sabi refers to an aesthetic philosophy and vision applied to objects, which alludes to beauty in imperfections and the value of the passage of time, and openly accepts the deterioration and transience of existence, both human and material. Wabi-Sabi আর্ট ফর্ম নিয়ে দেখছিলাম, এটা গোটা দুনিয়া খুলে গেল যেন। এর যুতসই কোনো বাংলা নেই বোধহয়, তবে মোদ্দা কথাটা হলো finding beauty within the imperfections of life. এই ল্যাজে গোবরে হয়ে থাকা জীবন থেকে রূপ-রং-রস খুঁজে নেওয়া। এভাবেই ভালো থাকতে হয়, অনেক অনেক না পাওয়ার মাঝে ছিঁটেফোঁটা প্রাপ্তিতেই হাসিমুখে থাকতে শেখা। ব্রক্ষ্মজ্ঞানীর বাণী আপাতত এটুকুই, পরে কথা জমলে আবার গপ্প হবে’খন। 


পুনশ্চ: ছবিটা বাড়ি খুঁজতে গিয়ে তোলা। বাসস্ট্যান্ড এ। মনে হলো সমস্যা যতোই বড় হোক, এভাবে পোষ মানিয়ে নিলে দিব্যি চলে যাবে...😅




❤️ 1 💬 0
Read Full Post »
ধারাবাহিক

খুঁজে ফিরি - পর্ব ১

কিশোর ঘোষাল
26 Sep 2026

১


১৯৮৪ সালের একটা ডেট মনে করার চেষ্টা করে চলেছি বেশ কয়েকদিন। কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ল না দেখে কড়া নাড়লাম, উইকির দরজায়। উইকি বাড়ি আছো? সাড়া পেলাম, এবং উইকি বলল, 

“১৯৮৪ সালে এই দেশে আমাদের মনে রাখার মতো বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিল।

১২ই মার্চ – আজকের সুগায়িকা অত্যন্ত জনপ্রিয়া শ্রেয়া ঘোষালের জন্মদিন, আজ প্রায় বছর কুড়ি ধরে যিনি আপামর ভারতীয় সঙ্গীতরসিকের হৃদয়ে বিরাজ করছেন।

২রা এপ্রিল - স্কোয়াড্রন লিডার রাকেশ শর্মার মহাকাশ যাত্রা।

২৩শে মে – শ্রীমতি বাচেন্দ্রি পাল প্রথম ভারতীয় মহিলা অভিযাত্রী হিসেবে এভারেস্ট জয় করেছিলেন।

৪ঠা জুন – ভারতীয় সেনা অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে অপারেশন ব্লু স্টার শুরু করেছিল।

৭ই জুলাই – দূরদর্শনে অশোককুমার অভিনীত “হামলোগ” সিরিয়াল শুরু হয়েছিল। বেশ কয়েকবছর ধরে একটানা চলা এই সিরিয়ালটি সে সময় ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল।

৮ই আগস্ট – মাত্র ১/১০০ সেকেণ্ড পিছিয়ে থাকার জন্যে পি টি ঊষাকে অলিম্পিকের মেডেল হারাতে হয়েছিল।

২৪শে আগস্ট – ভারতে প্রথম ৩ডি সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল, মালায়লী ভাষায় ছোটদের জন্যে বানানো এই সিনেমার নাম - My Dear Kuttichathan।

২৪শে অক্টোবর – ভারত তো বটেই, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মেট্রো রেলের যাত্রা শুরু হয়েছিল কলকাতায়, ভবানীপুর থেকে এসপ্ল্যানেড।

২৭শে অক্টোবর – ভারতের অন্যতম সেরা পেস বোলার ইরফান পাঠানের জন্মদিন। বড় হয়ে ওই তরুণ ইরফান বল করতে এলে বহু বিরোধীপক্ষীয় ব্যাটারের মুখ শুকিয়ে যেতে।  

৩১শে অক্টোবর – নিজেরই দুই নিরাপত্তারক্ষীর গুলিতে নিহত হলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয়েছিল শিখ নিধন যজ্ঞের বীভৎস তাণ্ডব। 

৩রা ডিসেম্বর – ভূপাল গ্যাস-লিক ট্র্যাজেডি – ইউনিয়ন কার্বাইডে মিথাইল আইসোসায়ানেট গ্যাস লিক হওয়ার কারণে বহু মানুষের মৃত্যু এবং হাজার হাজার মানুষের অসুস্থ হয়ে পড়া ও পঙ্গু হয়ে যাওয়া।

 

কিন্তু যে তারিখটি আমি খুঁজছিলাম সেটা পেলাম না। সঠিক তারিখের সন্ধান না পেলেও, এটা স্বীকার করতে কোন বাধা নেই – এই বছরটি আমাদের দেশের পক্ষে – সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবার অন্যদিকে আমাদের ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক এবং ক্রীড়া জগতের পক্ষেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমার মতো ম্যাংগো-মানুষের কথা উইকির স্মরণ করার দায় থাকতে পারে না। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত পরিসরে এই বছরটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, আমার পরবর্তী জীবনে এর প্রভাব ছিল অপরিসীম।

প্রথমটি হল আমার কর্মজীবনে প্রথম রাখা। সম্ভবতঃ তারিখটি ছিল ১৯৮৪-র ২৩ বা ২৪শে ফেব্রুয়ারি। ওইদিন ইন্টারভিউ দেওয়ার ঘন্টা খানেকের মধ্যেই হাতে পেয়েছিলাম আমার নিয়োগপত্রটি। সেই অনুভূতি আজও আমার মনে অম্লান। এরপর আমার জয়েনিং ডেট ছিল পয়লা মার্চ, ১৯৮৪ – সেদিনটাও আমার কাছে ছিল এক আশ্চর্য স্বপ্নপূরণের দিন।

আর দ্বিতীয়টি হল আমার মাতৃবিয়োগ – ৪ঠা ডিসেম্বর সকালে নিত্যপূজা সেরে নিজের জন্যে এক কাপ চা বানাতে গিয়ে তিনি কেরোসিন স্টোভ বার্স্ট করে দগ্ধ হয়ে যান। তৎক্ষণাৎ তাঁকে পিজি হসপিট্যালে ভর্তি করানো হয়। প্রাথমিক পরীক্ষার পর ডাক্তারদের মতামত ছিল – মোর দ্যান ৮৫% বার্ন ইনজুরি, এক ঈশ্বর ছাড়া এ মানুষকে ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। দুদিন পর ৬ই ডিসেম্বর, তিনি বিকেলের দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই মৃত্যুর অভিঘাত আজও আমি বহন করে চলেছি প্রতি নিয়ত। জীবনের অজস্র সাফল্য, আনন্দ কিংবা আনুকূল্যের দিনে তাঁর অনুপস্থিতি যেমন অনুভব করেছি। তেমনই জীবনের প্রতিটি ব্যর্থ, বেদনা এবং প্রবঞ্চনার দিনে, দীর্ঘপ্রতিটি দিন গুনতে গুনতে আজ এগিয়ে চলেছি মহামুক্তির দিকে। কিন্তু যাওয়ার আগে আজ এটুকু বুঝেছি - মন্দিরের দেববিগ্রহে ঈশ্বর থাকেন না, কোনদিনই ছিলেন না। তিনি আমাদেরই পাশে থাকেন - মাতৃ ও পিতৃরূপে - কখনো প্রকাশ্যে কখনো অন্তরে।


চলবে...


শ্বাস ফেলে মনে করেছি, তুমি যদি থাকতে....”।


❤️ 1 💬 0
Read Full Post »
আড্ডা

প্রলাপ

@Sharmistha
24 Sep 2026

মা বলতো ‘আপ রুচি খানা, আর পর রুচি পরনা’ মেয়ে বলে, ‘মাই বডি, মাই চয়েস’ আর আমি বলি, ‘কমফোর্ট ফুড, আর ইনভিজিবল ক্লোক’। ঘরে একা থাকতে ভালো লাগেনা বলে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। গুচ্ছের বেরি দেখলাম। লাল, খয়েরী, কমলা, হলুদ, নীল, কালো। সব এডিবল কিনা বলতে পারবো না। দেখলাম। ছবি তুললাম।‌ হেঁটে হেঁটে হাঁটু ব্যথা হলে একটু ছায়া ছায়া খুঁজে বসেছিলাম। ছায়া নয়। ছায়া ছায়া। মেঘ সরে গেলে হালকা রোদ আসছিল। ডাক্তার বাবু বলেছেন ‘ডি’ খেতে। সকালে রান্না বান্না করে ল্যাদ খাই, তাই রোদ খাই দুপুরে। খেয়ে দেয়ে পাড়া বেড়ানো। মাথার মধ্যে নানান কথা, শোনাবো কাকে? 

মেয়েটা কত দূরে! সে সিনে প্রেমী। প্রচুর সিনেমা দ্যাখে এবং উপযুক্ত সময়ে ডায়ালগ বসায় কথায়। বলে “মা, ‘জিন্দেগী লম্বি নেহী, বড়ি হোনি চাহিয়ে!’ জানো কোন সিনেমার?” আমি বলি হুম্। তা, এখন এই বেঞ্চ এ বসে ভাবছি, আমার এই লঅঅঅঅমবা জীবনটা নিয়ে আমি কী করবো? ভাবতে ভাবতে কুরুশ কাঁটা বার করি। দুটো লাইন বুনি আর মানুষ দেখি। সাদা, কালো, বাদামী, হলুদ। দেখি আর ভাবি, আচ্ছা, ঐ যে দক্ষিণ এশিয় মেয়েটি পুতুলের মতো দুটো কুকুর নিয়ে বসে আছে শান্ত হয়ে ও কি আমার মেয়ের বয়সী? ওর মা ওকে বসিয়ে ব্যাঙ্ক এ ঢুকে গেছে পনের মিনিট হতে চললো। ও বেশ হালকা পোশাকে আছে। ইয়াং ব্লাড। আমার মেয়েও বলে, ‘আরে মা, জ্যাকেট লাগলে পরে নেব, আমার ঠান্ডা লাগে না অত!’ আমার পাশে আপাদমস্তক ঢাকা চাপা দেওয়া একজন বসে আছেন। হাতে লাঠি। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এলেন। বোঁচকা ও আছে সাথে। সত্যি! অনেকদিন পর ইনফ্যাক্ট এমন বোঁচকা দেখলাম। চকচকে রেশমী সবুজ কাপড়ে হলদে ফুলের ছাপা। মামাবাড়ি থেকে ফেরার সময় দিদা বোঁচকায় বেঁধে ক্ষুদের চাল দিত। দিদার শাড়িতে, ট্রাঙ্কের কাঁথায় কেমন একটা ইতিহাস ইতিহাস গন্ধ লাগতো। এখন আমার মেয়ে বলে, “মা তোমার গা থেকে কেমন দিদা দিদা গন্ধ বেরোচ্ছে! অ্যাঁআআআ…আমার সোনা মা টা বুড়ো হয়ে যাচ্ছে!” ভাবনার লাগাম নেই। নিমেষে এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রামে তবে কেন্দ্রে সেই মেয়ে! ও কলেজ চলে যাওয়ায় আমার দিন রাত যেন পঞ্চাশ ঘন্টার! 


দুপুরের খাবারটা ভালো হয়নি। তাই ঠান্ডা মেরে গেছি। দেখতে যতই পত্রিকার রেসিপি পৃষ্ঠার মতো হোক না কেন, খেতে বসে জাবর কাটলাম! দেখুন ছবি।

❤️ 3 💬 1
Read Full Post »
ধারাবাহিক

কুবের সেনের ধারবাকি - ২

রোহণ কুদ্দুস
23 Sep 2026

নিজের নির্ধারিত সিটে বসেই কুবের ফোঁত করে একটা নিশ্বাস ছেড়ে দেখলেন পাশের সিটের অনিমেষ সান্যাল তাঁর দিকে ভ্রুকুটি নিয়ে তাকিয়ে আছেন— “এরকম ঝোড়ো কাকের মতো উড়তে উড়তে এলে? ব্যাপার কী?” কুবের আঙুল চালিয়ে মাথার চুলগুলো ঠিক করতে করতে আলগোছে উত্তর দিলেন— “আর বোলো না। সকাল-সকাল ঝামেলায় পড়েছি।” সান্যাল তাঁর কুড়ি বছরের সহকর্মী। প্রায় দিনই পাশাপাশি বসে অফিসে যান। সংসারের মোহমায়া, স্ত্রীর মুখঝামটা, সরকারের স্বজনপোষণ, বিরাট কোহলির তিরিক্ষি মেজাজ— এই সব নিয়েই সুখ-দুঃখের কথা হয় একটু-আধটু। তাই আজকের ক্রেডিট কার্ড কাণ্ডের কথাও বলেই ফেললেন কুবের। 

ঘটনা শুনে সান্যাল চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন কুবেরের দিকে— “আমি তখনই বলেছিলুম কিন্তু। ওই ফাঁদে পা দিওনি। শুনলে আমার কথা? কোথাকার কে মেয়ে, জানা নেই, শোনা নেই; তার মায়ের কিডনি অপারেশনের জন্যে তুমি ক্রেডিট কার্ড নিয়ে ফেললে।” কুবের সংশোধন করে দিলেন— “মায়ের অপারেশন নয়, দিদির। বিধবা দিদির।” সান্যাল নাক দিয়ে ঘোঁৎ করলেন একটা— “ওই হল। মা অন্ধ। বিধবা দিদির কিডনি ফেল। আর ভাইয়ের হাত উড়ে গেছে বোম বাঁধতে গিয়ে। এ যেন হিন্দি ফিলিম দেখছি। আর তার মধ্যে তুমি হয়েছ ত্রাতা। ফাদার ফিগার।” এই নিয়ে সান্যাল আগেও তাঁকে কথা শুনিয়েছেন। তাই কুবের এই প্রসঙ্গ এড়াতে জানালার বাইরে মনোনিবেশ করলেন। সান্যাল তবু ছাড়ার পাত্র নন— “তখন খুব তো ক্রেডিট কার্ড গছিয়েছিল। এখন তাকে ফোন করে বলো কেমন বাঁশটা খেয়েছ তুমি।”

মেয়েটার নাম মল্লিকা। কী করে তাঁর ফোন নাম্বার পেয়েছিল কে জানে। একদিন রোববার দুপুরে ফোন করে জিজ্ঞাসা করল— “স্যর, আপনার ক্রেডিট কার্ড দরকার?” কুবের খাওয়া-দাওয়ার পাট সেরে সবে বিছানায় পিঠ ঠেকিয়েছেন। মেয়েটা ক্রেডিট কার্ডের মহিমা ব্যাখ্যান যা করল, তার অর্ধেক কানের বাইরেই থেকে গেল। যেটুকু ঢুকল তার পুরোটাই আবার কান থেকে গড়িয়ে বালিশে পড়ে গেল। ফোনটা কোনওমতে কাটতে পারলে বাঁচেন, তাই আলগোছে দু-চারটে ‘হুঁ-হাঁ’ করে ফিরে গেলেন দিবানিদ্রায়। 

‘না’ বলতে পারাটা যে মানুষকে কত বড় ঝামেলার হাত থেকে বাঁচাতে পারে সেটা কুবের টের পেলেন পরের দিন। অফিসে একগাদা ফাইলের মধ্যে ডুবে আছেন; এক মহিলার ফোন এল— “স্যর, মল্লিকা বলছি। আপনি ডকুমেন্টগুলো এনেছেন তো?” কুবের আকাশ থেকে পড়লেন— “কীসের ডকুমেন্ট?” ফোনের ওপ্রান্তে মল্লিকা বেশ ক্ষুব্ধ— “আপনার ক্রেডিট কার্ডের ডকুমেন্ট। কাল কথা হল যে?” ভাতঘুমের আবছা স্মৃতি হাতড়ে বিশেষ সুবিধা করতে না পেরে কুবের ব্যস্ততা দেখালেন— “আমার এখন অনেক কাজ। আপনি পরে ফোন করুন।” ওদিক থেকে করুণ স্বর ভেসে এল— “কিন্তু স্যর আপনি যে কাল বলেছিলেন আপনার অফিসে আসতে। আমি কতদূর থেকে এলাম। আবার ফিরে যাব?”

মেয়েটা তাঁর অফিসের উলটোদিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে। কুবের রাস্তার দুদিক দেখে নিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হলেন। এই আপদ এখনই ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। ক্রেডিট কার্ডের মতো সৌখিন জিনিস তাঁর মতো ছাপোষা লোকের জন্যে নয়। টাকাপয়সা প্লাস্টিকের হলে নেহাতই খেলনা মনে হয়। তিনি কাছে আসতেই মেয়েটা তার কাঁধের ঝোলা থেকে ফস করে একটা ফর্ম বের করল— “স্যর এই ফর্মটাতে আপনাকে তিন জায়গায় সই করতে হবে। আমি দেখিয়ে দিচ্ছি। সাথে প্যান কার্ড, পাসপোর্ট বা ভোটার আইডি কার্ড...” মেয়েটাকে থামিয়ে দিয়ে কুবের দৃঢ় গলায় বললেন— “দেখুন দিদিমণি, আমার ক্রেডিট কার্ডের দরকার নেই। কাল বোধ হয় আমি ঘুমের ঘোরে ছিলাম, তাই আপনাকে অফিসে আসতে বলেছিলাম। কিন্তু সত্যি করেই আমার কোনও কার্ডের...” কথা শেষ করতে পারলেন না কুবের। তার আগেই মেয়েটা ফোঁপাতে আরম্ভ করেছে।

“আপনি প্লিজ একটু ভাবুন স্যর, বাড়িতে চারজন মানুষ আমরা। একা আমাকে সংসার চালাতে হয়। মা আগে সেলাই শেখাত, এখন চোখের অসুখে আর দেখতেই পায় না। বাবা চলে যাওয়ার আগে দিদির বিয়ে দিয়েছিল, সেও বিধবা হয়ে গেল। এখন তার কিডনির অসুখ। একটা ভাই। কুসঙ্গে পড়ে সেও গোল্লায় গেছে।” কুবের পড়লেন মহা ফাঁপরে। মেয়েটা কথা বলতে বলতে ফ্যাঁচ-ফ্যাঁচ করে কাঁদছে। তাঁর মতো মধ্যবয়স্ক মানুষের সামনে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকা তরুণী বোধ হয় খুব একটা শুভ লক্ষণ নয়। আশেপাশের পথচারীরা ঘুরে ঘুরে দেখছে। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে পকেট থেকে রুমাল বের করে মেয়েটার দিকে এগিয়ে দিয়ে একটু নরম গলায় বললেন— “দ্যাখো মল্লিকা, এইভাবে কেঁদো না। এই নাও।” মানিব্যাগ থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে বললেন— “এটা রাখো। বাসভাড়া।” মেয়েটা ফোঁপাতে ফোঁপাতে টাকাটা তাঁর হাত থেকে নিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় প্রশ্ন করল— “আপনি সত্যিই কার্ডটা করাবেন না? আপনারটা হলেই এ মাসে পঞ্চাশটা হয়ে যেত। দিদির অপারেশান করাতে টাকার খুব দরকার।”

কুবের মেয়েটাকে ভালো করে দেখলেন এতক্ষণে। এলোমেলো চুল, চোখে মুখে অযত্নের ছাপ স্পষ্ট, পরনে একটা ছাপা সালোয়ার কামিজ, হাতের সরু কব্জিতে একটা সস্তা ঘড়ি। কেমন মায়া হল। তাঁর ছেলে পুলুরই বয়সি হয়তো। এই বয়সে এই একা মেয়েকে সংসার চালাতে হচ্ছে। একটু দোনামনা করে জিজ্ঞাসা করলেন— “কার্ডটা নিলে কী ব্যবহার করতেই হবে? আমার তো ক্রেডিট কার্ড কোনও কাজে লাগে না। বুঝতেই পারছ।”

দিন দশেকের মধ্যেই ক্রেডিট কার্ড পৌঁছে গিয়েছিল তাঁর অফিসের ঠিকানায়। মল্লিকার কথা এখন মনে পড়ে যেতেই কুবের মোবাইল থেকে তার নাম্বারটা খুঁজে বের করলেন। 

দু-চারবার রিং হতেই ওদিক থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল— “কে বে?” কুবের আন্দাজ করলেন, নিশ্চয় মল্লিকার বখাটে ভাইটা। গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর হলেন— “মল্লিকা আছে?” ওপারের ব্যক্তিটি একটু থমকে জিজ্ঞাসা করলেন— “কী দরকার?” কুবের একই স্বরে বললেন— “সেটা মল্লিকাকেই বলব। ফোনটা দিন।” ওদিক থেকে ঘ্যাসঘ্যাস করে হাসি ভেসে এল— “আমাকে টপকে মল্লিকা, চন্দনা, রেশমা কাউকে পাবেন না। কী দরকার আমায় বলুন। আর যদি মাল দেখার পরে টাকাপয়সার কথা বলতে চান, আমার অফিসে চলে আসুন। পুরো ক্যাটালগ নামিয়ে দেব।”

ফোন কেটে সান্যালের দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত হাসলেন কুবের— “মনে হয় মল্লিকার নাম্বার বদলে গেছে।”

❤️ 4 💬 2
Read Full Post »
ভ্রমণ

ফিজিতে দিন কয়েক ৪

@himadrisekhardatta330
23 Sep 2026

ফিজিতে দিন কয়েক 

৪

দেখতে দেখতে, আমার ফিজিযাত্রা-র এক সপ্তাহ পুরো হয়ে গেল। এখানে পৌঁছানোর পরে, তৃতীয় দিনে, মেয়ে অফিস বেরিয়ে যাবার পর, আমি আর জামাই দুজনে বেরোলাম বাজারে যাব বলে। ওয়াইলোকুতে ঘরের কাছে, তেমন ভাবে বাজার লাগে না- সামান্য লোকাল শাক সবজী, চাষীরা নিয়ে বসে। আমাদের উদ্দেশ্য কোন স্পেশালিটি আইটেমের বাজার করা যদিও ছিল না, আমাকে এখানকার বাজার দোকান সম্বন্ধে একটা ধারনা দেওয়াই ছিল আসল কারণ।

ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে কল করে, জামাই ট্যাক্সি ডেকে নেয়। ফোন করে, নাম, কোথা থেকে কোথায় যাব বললেই, ট্যাক্সি দুমিনিটের মধ্যে তোমার কাছে উপস্থিত হবে। আজ বুধবার, লোকালাইজড ঝিরিঝিরি বৃষ্টিও হচ্ছে। গায়ে লাগে না, কিন্তু বেশিক্ষণ থাকলে মাথা ভিজবে। আমার মাথায় স্বাভাবিক কভার নেই, তাই আমি ছাতা নিলাম। গাড়িতে, বাজার এলাকায় পৌঁছে দেখি, বৃষ্টি একেবারেই নেই। বেশ আরাম করে, আমরা বাজার ঘুরে ঘুরে দেখলাম। কলকাতার সাথে বিশেষ তফাত নেই। যদিও কলকাতা একশো ভাগ ট্রপিকাল আবহাওয়ার আওতায় নেই - কিন্তু ফিজি পুরোপুরি ট্রপিকাল, রেইনফরেস্ট বিশিষ্ট উদাহরণ ট্রপিকাল দেশের। এখানে এক্সট্রা আইটেম হিসাবে, বাজারে দারুন আনারস, তরমুজ, কাপ্পা বলে একরকমের ফল (ছোট কমলালেবুর মত), এগুলি বিশেষ চোখে পড়ল। এখানে লেবু (lemon) গুলি বেশ বড়। কলা কাঠালি কলা সবেচেয়ে বেশি। পেঁয়াজ সাদাটে। আলু প্রায় কালো। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের শাক-পাতা ইত্যাদি।

তবে,ফিজি আইল্যান্ডের প্রধান ও সবচেয়ে জনপ্রিয় ভেজিটেবল বা সবজি হলো কাসাভা (Cassava) এবং টারো বা ডালো (Taro/Dalo). এগুলো মূলত স্টার্চ বা শর্করা সমৃদ্ধ শিকড়জাতীয় সবজি (Root Vegetables), যা ফিজির মানুষের প্রধান খাদ্য (Staple Food) হিসেবে প্রতিদিনের খাবারে আলুর মতো ব্যবহৃত হয়. কাসাভা অনেকটা আমাদের কলকাতার মানকচুর মত, কিন্ত আরো শক্ত। চিপস খেয়ে দেখেছি - বেশ শক্ত, দাঁতে জোর লাগে। 

ফিজির প্রধান সবজিগুলোকে মূলত দুটি ভাগে দেখা হয়:

১. প্রধান শিকড়জাতীয় সবজি (Root Crops):

কাসাভা (Cassava / Tavioka): এটি ফিজির সবচেয়ে সাধারণ ও জনপ্রিয় সবজি. স্থানীয়ভাবে একে 'তাভিওকা' বলা হয়। এটি সেদ্ধ করে, পুড়িয়ে বা ভেজে (চিপসের মতো) খাওয়া হয়। এটিকে শিমূল আলুও বলা হয়। 

ডালো বা টারো (Dalo / Taro): এটি ফিজির ঐতিহ্যবাহী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সবজি। মে মাসে ফিজিতে 'টারো ডে' বা ডালো দিবসও পালন করা হয়। আমাদের কলকাতা বা পশ্চিমবাংলার গ্রামের বড় বড় কচু গাছ গুলি যেমন। 

মিষ্টি আলু (Kumala / Sweet Potato) ও ইয়াম (Yam / Uvi): এগুলোও ফিজির মানুষের অন্যতম প্রধান প্রিয় সবজি।

২. প্রধান শাকসবজি ও অন্যান্য (Green Vegetables)

রৌরৌ বা টারো পাতা (Rourou / Taro Leaves): ডালো বা টারো গাছের সবুজ পাতা ফিজিতে শাক হিসেবে প্রচুর খাওয়া হয়। নারকেলের দুধে এই পাতা সেদ্ধ করে 'রৌরৌ' এবং 'পালুসামি' (Palusami) নামক অত্যন্ত সুস্বাদু ঐতিহ্যবাহী পদ তৈরি করা হয়। 

বেলে (Bele): এটি ওশেনিয়া অঞ্চলের একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ঐতিহ্যবাহী সবুজ শাক, যা দেখতে কিছুটা পালং শাকের মতো। ফিজির প্রায় প্রতিটি পরিবারেই এটি খাওয়া হয়।

বেগুন (Baigan / Eggplant) এবং ঢ্যাঁড়শ (Okra): ইন্দো-ফিজিয়ান (ভারতীয় বংশোদ্ভূত ফিজিয়ান) সংস্কৃতির প্রভাবের কারণে ফিজিতে বেগুন ও ঢ্যাঁড়শ ব্যাপকভাবে চাষ এবং খাওয়া হয়।

দুরুকা (Duruka): একে 'ফিজিয়ান অ্যাসপ্যারাগাস' বলা হয়। এটি ফিজির একটি বিশেষ ও অনন্য সবজি, যা দেখতে অনেকটা আখ বা কচি বাঁশের মতো এবং নারকেলের দুধে রান্না করে খাওয়া হয়।

(সোর্স : ফেসবুক পেজ,ক্যাপ্টেন কুক ক্রুজ-ফিজি এবং উইকিপেডিয়া২)

এগুলি ছাড়া, বাজারের একটা অংশে যেটা ভর্তি তা হল, একধরনের শিকড়, যার স্থানীয় নাম কাওয়া (kava)। কাওয়া (Kava)—যা ফিজিতে স্থানীয়ভাবে 'ইয়াকোনা' (Yaqona) বা 'গ্রগ' (Grog) নামে পরিচিত—হলো ফিজির ঐতিহ্যবাহী ও জাতীয় পানীয়। এটি গোলমরিচ গোত্রের একধরণের উদ্ভিদের (Piper methysticum) শুকনো শিকড় গুঁড়ো করে তৈরি করা হয়। ফিজির সামাজিক, ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই পানীয়টির অত্যন্ত গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। (সোর্স : ফিজি ট্যুরিজম পেজ থেকে, ছবি সহ)

এই ট্যুরিজম পেজেই, কাওয়া বানানো এবং খাবার নিয়ম পদ্ধতি নিয়ে ছোট একটি নোট পাই, যা ইংরাজীতে ছিল। আমি অনুবাদ করে এখানে দিলাম- যারা উৎসাহী তাদের পড়ার জন্য। কারণ আপনি যদি ফিজি ভ্রমণে যান, তবে তাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করতে একটি ঐতিহ্যবাহী কাওয়া অনুষ্ঠানে (Tourism Fiji) অংশ নেওয়া অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা হতে পারে।

কাওয়া কী এবং কীভাবে তৈরি হয়?

উৎস: কাওয়া উদ্ভিদের শিকড় রোদে শুকিয়ে প্রথমে মিহি গুঁড়ো করা হয়। 

প্রস্তুত প্রণালী: এই গুঁড়ো একটি বিশেষ কাপড়ে (Straining cloth) নিয়ে ঠান্ডা পানির সাথে মেশানো হয়। এরপর হাত দিয়ে চেপে চেপে মাটির রঙের একটি তরল নির্যাস বের করা হয়।

পরিবেশন: ঐতিহ্যগতভাবে এটি 'তানোয়া' (Tanoa) নামক একটি কাঠের বড় পাত্রে তৈরি করা হয় এবং 'বিলো' (Bilo) নামক নারকেলের মালা বা বাটিতে পরিবেশন করা হয়। 

🧠 এর স্বাদ ও শারীরিক অনুভূতি

স্বাদ: কাওয়ার স্বাদ বেশ তেতো এবং মাটির মতো। এটি মোটেও কোনো মিষ্টি বা সুস্বাদু পানীয় নয়।

অনুভূতি: এটি কোনো অ্যালকোহল নয়, তবে এটি পানের পর মুখে ও জিহ্বায় একটি অবশ বা অসাড় অনুভূতি (Numbing sensation) তৈরি হয়। কাওয়া মনকে শান্ত ও শিথিল করে এবং পেশির ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে।

🤝 সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ও ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান (Sevusevu)

ফিজিতে কোনো অতিথি বা পর্যটক যখন কোনো ঐতিহ্যবাহী গ্রামে যান, তখন গ্রামের প্রধান বা চিফকে (Chief) সম্মান জানিয়ে কাওয়ার শিকড় উপহার দিতে হয়, যাকে 'সেভুসেভু' (Sevusevu) বলা হয়। এটি ফিজিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বন্ধন এবং সামাজিক সখ্যতার প্রতীক। 

🥥 কাওয়া পানের কিছু নিয়ম (Etiquette)

আপনি যদি ফিজিতে কোনো কাওয়া অনুষ্ঠানে অংশ নেন, তবে স্থানীয় সংস্কৃতি বজায় রাখতে নিচের নিয়মগুলো অনুসরণ করতে হয়: 

পোশাক: মার্জিত পোশাক পরতে হবে। নারী ও পুরুষ উভয়েরই কাঁধ এবং হাঁটু ঢাকা থাকতে হবে (ফিজির ঐতিহ্যবাহী স্কার্ট 'সুলু' পরা ভালো)। জুতো, টুপি ও সানগ্লাস খুলে বসতে হবে। 

গ্রহণ করার নিয়ম: যখন আপনাকে এক বাটি (Bilo) কাওয়া দেওয়া হবে, তখন জোরে একবার হাততালি দিয়ে কাপটি হাত বাড়িয়ে নিতে হবে এবং বলতে হবে "বুলা" (Bula) (ফিজিয়ান ভাষায় স্বাগতম বা শুভকামনা)। 

পান করা: চুমুক দিয়ে না খেয়ে পুরো বাটির কাওয়া এক টানে বা এক ঢোকে শেষ করতে হয়। 

ফেরত দেওয়া: খালি বাটিটি ফিরিয়ে দেওয়ার সময় তিনবার হাততালি দিতে হয় এবং বলতে হয় "ভিনাকা" (Vinaka) (যার অর্থ ধন্যবাদ)। 

স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে (আমার মেয়ের বাড়ির কমপ্লেক্সের সিকুরিটি গার্ড যেমন) জানতে পারি, কাওয়ার নিজস্ব স্বাদ মাটি মাটি। সেটাকে এক নারকোলের বাটি থেকে এক ঢোঁকে, কি ভাবে কেউ খেতে পারে? তাও আবার স্বাদে তেঁতো। আমি দেশীয় প্রথায়, সম্মান জানাচ্ছি- কিন্তু আমি ঐতিহ্যবাহী কাওয়া অনুষ্ঠানে না যাবারই, আপ্রাণ চেষ্টা করব। মনে পড়ে গেল, কারমাটারে, একবার ফিল্ড করার সময়( তালচের গ্লেসিয়েশনের ওপর), আমি একজন রেলওয়ে কর্মী, যিনি পি এল আই পদে ছিলেন- বাঙালি, তার বাসায় থাকতাম। তাকে এক সাঁওতাল বিয়েতে নিমন্ত্রণ করেছিল-সঙ্গে আমাকেও। আমি বিয়ের জাঁকজমক আর পদ্ধতি দেখতে উৎসুক ছিলাম। তখন আমি পি এইচ ডি-র ছাত্র, আই আই টি খড়্গপুরে। সেই বিয়ের ভোজে, সাপের মাংস বিশেষ পদ ছিল। প্যান্ডেলের কাপড়ের ফাঁক দিয়ে, আমি পালিয়ে ছিলাম। প্রামাণিক-দার বাড়ির কাছেই, মধুপুর- কলকাতা রেল লাইনের ধারে সেই বিয়ে দেখতে যাওয়ার কথা ভুলি নি। সাপের মাংস না'কি অবিকল মাছের মতই লাগে। 

যাক এসব। ফিজি থেকে বিদ্যাসাগরের শেষ জীবনের নিবাস স্থানে পৌঁছে গেছি। তবে পি এইচ ডি আমার করা হয় নি। সে সব অন্য কথা। সেই প্রফেসরও আজ বেঁচে নেই। 

শাকসবজীর বাজার দেখে, এবং জামাইয়ের দরকারের সব কিছু কিনে, আমরা গেলাম মাছের বাজারে। একমাত্র, পারশে, পমফ্রেট ছাড়া বাকি মাছ ছিল অজানা। না, হাঙর বা তিমি ছিল না। ছিল না কোন নৃশংসতার আভাস বা চিহ্ন। সব মাছ গোটা ছিল। বরানগর মাছের বাজারের মত, সিমেন্টের বাঁধানো সব দোকান গুলি। মাছের বাজার সুভা পোর্ট সংলগ্ন। এক ধরনের মাছ দেখলাম- যার মাথা থেকে পেটের অর্দ্ধেক পর্যন্ত পায়রার গলার মত সবুজ- আবার ল্যাজের একটু ওপর থেকে ল্যাজের পাখনা গুলি পর্যন্ত ডিপ সবুজ রঙের। এখানে প্যারট ফিশ বলে। 

সবজি বা মাছের বাজারের কেউই অরিজিন্যাল ফিজিয়ান নয়, এরা সকলেই ইন্দো ফিজিয়ান। ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশরা চিনি-বাগানে কাজের জন্য ভারত থেকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক নিয়ে আসে; তাদের বংশধররা Indo-Fijian। এই বিশেষ শ্রেণীর আগমনের ফলে, ফিজির ডেমোগ্রাফির এক বিরাট পরিবর্তন হয়। সেই সব কথা হবে আগামীতে। 

ক্রমশ...

পুন: যারা পড়ছেন বা পড়বেন, তাদের কাছে একটাই অনুরোধ, আপনাদের কোন ব্যাপারে কিছু বলার, জানার থাকলে বিনা সংকোচ করে, মন্তব্যে লিখুন৷ আমি তার উত্তর দেবার যথাসাধ্য চেষ্টা করব - যা হবে অথেনটিক। এখান থেকে ফিরে যাবার পরে, সব কিছুই আবার বই বা নেট ভিত্তিক হয়ে যাবে। এখন জিজ্ঞাসা করে ঘোড়ার মুখ থেকে জানতে পারব। ধন্যবাদ সকলকে৷


❤️ 3 💬 4
Read Full Post »
ঢাক পেটানো

ফোবিয়া

@Sharmistha
22 Sep 2026



কত রকম ভয় নিয়ে যে বেঁচে থাকতে হয়! খুব ছোট্ট থেকেই জুজুবুড়ির ভয়, দুষ্টুমি করেছ মানে আর রেহাই নেই, জুজুবুড়ি এসে সাংঘাতিক কিছু ‌একটা করে ফেলবে! আর একটু বড় হলে ১.ভূত-প্রেত(অন্ধকারে যায় না, ভূত আছে), তারপর ২. ভগবান( ভগবান সব দেখছে, পাপ দেবে কিন্তু! মাই ফুট!) তারপর ৩. দুষ্টুলোক, ছেলেধরা(কাঁধের বস্তায় ভরে নিয়ে যাবে), ৪. মাতাল(নড়বড়ে পায়ের লোকের দিকে তাকাতে হয়না), ৫. ক্ষ্যাপা ষাঁড়( ষাঁড় দেখতে পেলে আর রক্ষে নেই, পেটে দুটো ফুটো করে দেবে গুঁতিয়ে….গোটা ছোটবেলা ভয়ে ভয়েই কেটে‌ গেছে মাইরি! জানিনা, বাঙালি মা মাত্রেই কী এত ভয় দেখায়? নাকি শুধু আমার মা ই? আমি অন্তত মেয়েকে জুজুবুড়ি,ভূত-ভগবানের ভয় দেখিয়ে বড় করিনি। দুষ্টুলোকের ভয় দেখাতে হয়েছে, সাবধান করতে হয়েছে/হয়, কিন্তু আজ সে প্রসঙ্গে যাচ্ছিনা।

 

আমি খুব ভয় পাই শুঁয়োপোকা দেখলে। দেখলেই আগে বুকের মধ্যে ছ্যাঁত করে ওঠে! কত রকম যে শুঁয়োপোকা দেখেছি আর মিনি হার্ট অ্যাটাক হয়েছে তার ক'টা ফিরিস্তি দেব আজ, তাতে যদি এই মাঝবয়সে এসেও ভয়টা কমে! 

আমার বাবার বাড়ির পাড়াটা মহানন্দা নদীর ধারে। ছোটবেলায় প্রায়দিন বিকেলবেলায় মা আর পাড়ার কাকী, পিসিদের সাথে নদীর ধারে যেতাম। আমাদের পাড়ার সীমানা বরাবর মাটির বাঁধ দেওয়া ছিল। বেশ উঁচু, ওঠার পর গড়গড়িয়ে নেমে যেতাম নদীর চড়ায়। যতদূর চোখ যায় সবুজ মাঠ, উত্তর দিকটার নীল পাহাড়(চম্পাসারি, হঠাৎ কলোনীর দিকটায়), আর মাঠের শেষে নদী। বেশ জল থাকতো তখন। বরফ ঠান্ডা মহানন্দার জল, আর যেখানে স্রোত একটু কম সেখানে নদীর নীচের পাথর,নুড়ি, বড় বড় বোল্ডার, ছোট ছোট মাছ, ব্যাঙাচী ইত্যাদি দেখা যেত। এর মধ্যে ভয়ের তো কিছু নেই! তাহলে এ কথা বলছি কেন? বলছি, কারন মহানন্দার পাড়ে বাড়ি ছিল বলে মাটি ছিল অত্যন্ত ভালো আর সবার বাড়িতেই ছিল‌ গাছ গছালি। আমাদের বাড়িতেই ছিল নারকেল, সুপুরি, পেয়ারা, আম, কাঁঠাল, জাহাজী কলা, পেঁপে গাছ। এতে ফল হতো। আর ছিল জলপাই, তেজপাতা,বাতাবিলেবু, আতা, শিশু গাছ। গেটের পর থেকে ঘরের সামনে পর্যন্ত দুদিকে লাইন ধরে পাতাবাহার। ফুল গাছের মধ্যে ছিল রঙ্গন, গোলাপ, দোলনচাঁপা, মাধবীলতা। এগুলো মাটিতে লাগানো। ঠিক ঘরের সামনে টায় একটা চা গাছ। আর মরশুমী ফুল তো ছিলই। আর ছিল শুঁয়োপোকা, মিলিয়নস অফ দেম!

সবচেয়ে সাংঘাতিক দিয়ে শুরু করি। আমাদের পাশে মিতা দিদিদের বাড়িতে ছিল গামারি গাছ। গামারি কাঠ যেমন ভালো, তেমন তাতে শুঁয়োপোকাও হতো! একদম গোড়া থেকে শুরু হয়ে ওপর পর্যন্ত! একটু গরম পড়লে মানুষের মতো‌ ওদেরও গা বোধহয় চিড়বিড় চিড়বিড় করতো, আর সব গাছ থেকে নেমে এদিক ওদিক যাত্রা করতো। হালকা umber রং এর, খুব রাগী দেখতে...আর জলদি জলদি হেঁটে যেত খুদি খুদি পায়ে। ওগুলো‌ গায়ে লাগলে ফোস্কা পড়ার মতো হয়ে যেত! আমরা পেছন দিকের জানালাটা খুলতামই না গরম কালে। তবুও মাঝেমধ্যেই টান‌টান করে পাতা বিছানায় তাদের দেখা যেত! কি যন্ত্রনা! প্রত্যেক বছর কাকু একদিন গাছের গোড়ায় কেরোসিন তেল গেলে সব শুঁয়োপোকা ‌পুড়িয়ে দিত। আবার বেশ কিছুদিন নিশ্চিত। 

এদিকে আমাদের গাছে হতো কালো‌ কালো‌ মোটা আপাত হার্মলেস শুঁয়োপোকা। ওগুলো দেখলেই মা মেরে ফেলতো। হয়তো বিকেলে কাজ টাজ সেরে বারান্দায় নিশ্চিন্তে বসে আছি, দেখি ঠিক আমার হাত খানেকের মধ্যেই উনি আসছেন...আগে তো 'আউ' বলে চিৎকার দিয়ে ছিটকে গেছি অনেক টা, তারপর মা ওটার ভবলীলা সাঙ্গ করেছে। তেজপাতা গাছে হতো মোটা মোটা সবুজ রোম ছাড়া পোকা। ওগুলো ‌থেকে প্রজাপতি হতো। খুব একটি নীচে দেখতাম না, দৈবাৎ কোনো পাখীর মুখ থেকে পড়ে গেলে তবেই দেখতাম। আর‌ ডাল, পাতা কাটা হলে‌ পাতার মধ্যেকার গোলগোল ফুটো দেখে বুঝতাম, তিনি ছিলেন। 

 চা গাছের শুঁয়োপোকা ‌খুব সুন্দর দেখতে। প্রায় চা ফুলের মতো। হলুদাভ সাদা, বড় বড় রোম, ওগুলো মারতে ইচ্ছে করতো না, তবে গাছ থেকে নেমে ঘরের দিকে হাঁটা দিলে নো মার্সি! মাধবীলতা গাছে একাধিক প্রজাতির পোকা হতো। শুঁয়ো ছাড়া কালো, সবুজ। আর শুঁয়োওয়ালা কালো, ছাইছাই। পাখী আসতো ঐসব খেতে। পাখী এলে‌ বুঝতাম গাছে পোকা হয়েছে। সেগুলো আবার মাকড়সার জালের মতো তন্তু বানিয়ে ঝুলতো! এবং যেহেতু গেটের ওপর ছিল গাছটা, মাঝে মাঝেই গায়ে মাথায় আবিষ্কার করতাম! কি যন্ত্রনা! 

গোলাপ গাছে হতো অদ্ভুত রকমের শুঁয়োছাড়া পোকা। সেগুলো খুব নজর না করলে বোঝা যেতনা। একদম গাছের সরু ডালের মতো, দু কর লম্বা, এবং এরা মুখ দিয়ে কামড়ে ধরে থাকতো। আমার খুব বিশ্রী লাগতো এগুলোকে। 

স্কুলে যাওয়ার পথে আর একটা গামারি গাছ ছিল, পাড়াতেই, প্রধাননগরে ওঠার মুখে। মা বলে দিয়েছিলো কখনও গাছের নীচে দিয়ে যাবিনা। ঐ বাড়ির লোকেরা কখনও শুঁয়োপোকা মারতো না, আর শুঁয়োগুলো হাওয়ায় উড়তো। একদিন বেমালুম ভুলে গিয়ে গাছের নীচে দিয়ে স্কুলে গেছি। যেতে যেতেই চুলকানি শুরু, আর স্কুলে গিয়ে দুহাত চাকা চাকা হয়ে ফুলে গেল! সে কি অসহ্য অবস্থা। আমার বন্ধু সুদেষ্ণা নুন নিয়ে এসেছিল স্কুলের উল্টোদিকের বাড়ি থেকে, সেই নুন দিয়ে হাত ডলে খানিক কমেছিল! আমার ভীষণ অপছন্দের গাছ গামারি।

আর একবার ক্লাস টুএলভে, নাকি ইলেভেন এ, নীহার স্যারের বাড়িতে পড়তে গেছি, উনি আমাদের স্কুলের উল্টোদিকের পাড়ায় থাকেন তখন। স্কুলে হিস্ট্রী পড়াতেন, তো স্যারের কোয়ার্টারে বাইরের বারান্দাটা ঘিরে ওখানে টেবিল আর বেঞ্চ পাতা ছিল। আমি বসেছি একদম কোনায়, লেট করেছিলাম প্রথমদিন, তাই ঘুপচিতে! হঠাৎ ঘাড়ে খোঁচা মতো লাগলো, হাত দিয়ে দেখি কিচ্ছু নেই! তারপর...ওরে বাবা! দেখি কোলের ওপর একটা কালো‌ শুঁয়োপোকা! সে ও পড়ে গিয়ে ভয় পেয়ে গোল্লা হয়ে রয়েছে। স্যার কে চিঁ চিঁ করে বললাম! তারপর বাইরে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে এলাম! এদিকে বুকের ভেতর হাতুরি পেটা হচ্ছে! 

আর মামারবাড়ী গেলে তো কথাই নেই! পাট কাটা হচ্ছে…..গোটা গ্রামে শুঁয়োপোকা! উঠোনে ডাল মাড়াই হচ্ছে...বাড়িময় শুঁয়োপোকা! এদিকে জিকাগাছ, ওদিকে সজনে গাছ, কোনায় কুলগাছ...ভর্তি শুঁয়োপোকা! বুকের মধ্যে ঢেঁকির পাড় আর হাতুরি পেটা!

এখনও শাকপাতায়, মটরশুঁটির মধ্যে পোকা পেলে ভয় পাই। পারতপক্ষে ফুল টুল কিনি না। পোকা থাকবেই। গ্যারেন্টি। আমার ছোট্ট বাগানেও হয়, সেগুলোকে অতটা ভয় করেনা অবশ্য। আমার মেয়ে ভয় পায় না। ওর প্রথম গল্পের বই 'The very hungry caterpillar' , হয়তো এ জন্যই ভয় পায়না । ওকে দেখাবার জন্য একবার একটা শুঁয়োপোকা পেলেছিলাম, সে পাতা খেয়ে মোটকু হয়ে গুটি বানিয়েছিল। একমাস ধরে লক্ষ্য করেছিলাম দুজনাই, কিন্তু কেমন হয়েছিল পরে দেখতে পাইনি! চুপচাপ উড়ে গিয়েছিল।


যতক্ষণ লিখছিলাম ততক্ষণ খ্যাসর খ্যাসর করে গা চুলকে গেলাম! পড়ে যদি কারুর গা চুলকোয় তবেই আমার লেখা সার্থক! অন্তত আমার সমব্যথী কাউকে পাব! দেওয়া ছবির সাথে লেখার সম্পর্ক বলতে ওটা আমার বাগানের ফুল। যিনি উড়ে বসেছেন তিনি আমার প্রিয়। ওনাকে ভয় নেই।



❤️ 2 💬 7
Read Full Post »
ধারাবাহিক

কুবের সেনের ধারবাকি - ১

রোহণ কুদ্দুস
21 Sep 2026

এক সোমবার সকালে কুবের সেন আবিষ্কার করলেন তাঁর ক্রেডিট কার্ড চুরি গেছে। 


কুবের টিভির সামনে বসে কপালভাতি করছেন, ফোনটা এল। ব্যাঙ্কের ফোন। এক সুমধুরভাষিণী সুপ্রভাত ইত্যাদি জানিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – “স্যর, আপনার দু মিনিট সময় পাব এখন?” সকাল সাতটার সময় ১০ সেকেন্ড সময় মেলাও মুশকিল। টিভির পর্দায় বাবা কুমারানন্দের দেখাদেখি কপালভাতি শেষ করে সোজা বাথরুম। দাড়ি কেটে, স্নান সেরে ঠিক সাড়ে সাতটায় তিনি খাবার টেবিলে। চিঁড়ে-কলা-চিনি মাখিয়ে হাপুস-হুপুস শব্দে জলখাবার সেরেই কুবের অফিসের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে দৌড়ান বাসস্ট্যান্ডের দিকে। আটটার বাসটা ফসকে গেলে মুশকিল – অফিস পৌঁছতে এখন পাঁচ মিনিট এদিক-ওদিক হলেই খচাং করে অর্ধেক দিনের মাইনে কাটা যায়। নতুন বসের মেজাজ টাকের কয়েক ইঞ্চি ওপরে চড়ে থাকে সবসময়।

কিন্তু কী আর করা? মোবাইলের ওদিক থেকে মিষ্টি করে এক ভদ্রমহিলা দু মিনিট চাইছেন। তার ওপর ব্যাঙ্ক থেকে ফোন করছেন। তার মানে আজ কপালভাতিটা গেল। এই সাত সকালেই এরা অফিসে পৌঁছায় কী করে? ব্যাজার মুখে টিভিটা বন্ধ করে কুবের বারান্দায় এলেন – “বলুন ম্যাডাম।”

ফোনের ওপার থেকে ভদ্রমহিলা মিষ্টি হেসে বললেন – “স্যর, আপনার ক্রেডিট কার্ড বিল এখনও ডিউ। কাল বিল জমা দেওয়ার শেষ তারিখ। কালকের মধ্যে বিল জমা না দিলে লেট ফাইন দিতে হবে।” এহেন মিছরির ছুরি কানের ভিতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করার আগেই কুবের মনে করার চেষ্টা করলেন গত চার-পাঁচমাসে ক্রেডিট কার্ডে আদৌ কিছু কিনেছেন কি না। এক মুহূর্ত চিন্তা করে বললেন – “ঠিক আছে ম্যাডাম, আমি টাকা জমা করে দেব।” তারপরই মনে পড়ল অফিসের ঠিকানায় ‘ক্রেডিট কার্ড স্টেটমেন্ট’ লেখা একটা লেফাফা প্রতি মাসেই আসে বটে; কিন্তু যেহেতু ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা বন্ধ করে দিয়েছেন, তাই সেগুলো আর খুলে দেখা হয় না। এ মাসেরটাও তাঁর টেবিলের হাজার কাগজপত্রের আড়ালে কোথায় যে পড়ে আছে, কে জানে। তাই জিজ্ঞাসা করে ফেললেন – “কত বিল এসেছে বলবেন একটু?” ওদিক থেকে এবার মোক্ষম তিরটা এল – “আপনার মোট ডিউ আছে আঠাশ হাজার তিনশো একুশ টাকা। লেট ফাইন এড়াতে কালকের মধ্যে অন্তত ছ হাজার পাঁচশো টাকা পে করতে হবে। হ্যাভ এ গুড ডে।"

ফোনটা রেখে কুবের ধাতস্থ হতে সময় নিলেন। এত টাকা কীভাবে খরচ হল? শেষবার বিল মেটানোর পর তিনি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারই করেননি।


মাস ছয়েক আগে পুজোর সময় পুরী যেতে ট্রেনের টিকিট কেটেছিলেন রেলওয়ের সাইট থেকে। কেটেছিলেন মানে তাঁর অফিসের দাশগুপ্ত কেটে দিয়েছিল। দাশগুপ্ত সেলস্‌-এ ঢুকেছে বছর দুয়েক, দারুণ চটপটে ছেলে। ট্রেনের টিকিট কাটতে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বের হবেন শুনে তাঁকে দেখিয়ে দিয়েছিল কোন ওয়েবসাইটে গিয়ে কী করে টিকিট বুক করতে হবে। শেষে ডেঁপোমি করে তাঁর কাঁধে হাত রেখে বলেছিল – “ইন্টারনেটের মতো জিনিস হয় না সেনদা। ট্রেনের টিকিট হোক বা সগ্‌গের। একটা ক্রেডিট কার্ড থাকলেই কেল্লা ফতে।” ক্রেডিট কার্ড দিয়ে টিকিট কাটো, পরের মাসে বিল এলে ব্যাঙ্কে গিয়ে একটা চেক জমা দিয়ে দাও।

ব্যাপারটা বেশ মনে ধরল কুবেরের। তাঁদের বাড়ির কাছেই একটা শপিং মল মাথাচাড়া দিয়েছে বছরখানেক হয়ে গেল। সেদিন অফিসফেরতা স্বপনের সবজি দোকানটা পাশ কাটিয়ে সোজা ঢুকে পড়লেন ঝাঁ-চকচকে সেই শপিং মলে। নামটা জবরদস্ত – ‘স্বপ্নবাজার’। পুরো পাঁচতলা জুড়ে স্বপ্নের সওদাগরি। শাক-সব্জি, মাছ-মাংস, রান্নার হাঁড়ি-বাসন থেকে আরম্ভ করে জামাকাপড় – সব আছে। 

একটা শপিং কার্ট টেনে নিয়ে ঘুরে ঘুরে রাজ্যের সবজি কিনলেন। দু হাতে দুটো ক্যারি প্যাকেটের ভারে হাতের শিরা ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। কিন্তু কেনাকাটার শেষে টিভিতে দেখা সুদর্শন মডেলের মতো মানিব্যাগ থেকে ফস করে ক্রেডিট কার্ডটা বাড়িয়ে দেওয়ার যে আনন্দ, তার তুলনায় ওটুকু কষ্ট কিছুই নয়। কাউন্টারের ওদিকের মেয়েটা মিষ্টি হেসে তাঁর কার্ডটা নিয়ে ঘষে দিল একটা গাবলু মার্কা যন্ত্রে আর তারপর বাড়িয়ে দিল পেমেন্ট রিসিপ্ট। দু-হাতে গাবদা দুটো প্যাকেট নিয়ে দরজার দিকে এগোতেই ইউনিফর্ম পরা দারোয়ান হাসিমুখে দরজা খুলে দিল। ক্রেডিট কার্ডের কী মহিমা! সরকারি অফিসের ছাপোষা কেরানিকেও মুহূর্তের মধ্যে বাদশাহ বানিয়ে দেয়। কেন যে এই লাইনটা ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলো তাদের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করে না? “মুহূর্তের মধ্যে বাদশাহ!” হাঁচোড়-পাঁচোড় করে হাতের বোঝা দুটো নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে কুবের নিজের ভাবনায় পুলকিত হয়ে উঠলেন।

কিন্তু পরের মাসের ক্রেডিট কার্ড স্টেটমেন্ট হাতে পেয়েই কুবেরের মনে একটা কুটিল প্রশ্নের উদয় হল – মুহূর্তের মধ্যে বাদশাহ নাকি মুহূর্তের জন্যে বাদশাহ? তিনজনের পুরীর রিটার্ন টিকিট বাদ দিয়েও, চারবার স্বপ্নবাজারে বাদশাহগিরি, একটা সওনা বেল্ট আর একটা ফুট ম্যাসাজার। শেষ দুটো বস্তু তাঁর গিন্নির আবদারে টিভির বিজ্ঞাপন দেখে কেনা। বেল্টটার প্রথমবার ব্যবহারেই কোমর আর শিরদাঁড়ার ব্যথায় দুদিন শয্যাশায়ী ছিলেন বলে ম্যাসাজারটাতে পা দিতে সাহস পেলেন না। তাঁদের কাজের লোক পঞ্চার মা বহুদিন ধরে একটা কাঠের পিঁড়ের জন্যে ঘ্যানঘ্যান করছিল। এখন ওই ফুট ম্যাসাজারে বসে সে আনাজ কাটে, কাপড় কাচে।

সেই প্রথম এবং শেষবার কুবের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেছিলেন। বিল চোকাতে জমানো টাকাতেও হাত দিতে হয়েছিল। প্রথমে ভেবেছিলেন কার্ডটা পুড়িয়ে ফেলবেন বা মাটিতে পুঁতে দেবেন। কিন্তু অসময়ে কাজে লাগতে পারে ভেবে কার্ডটার অন্তিম সংস্কার না করে কাউকে কিছু না জানিয়ে সেটা লুকিয়ে রেখেছিলেন শোবার ঘরের বাঙ্কের ওপর। বাতিল একটা কার্ডবোর্ডের বাক্সে পুরোনো কিছু খবরের কাগজ আর পত্রিকার মধ্যে একটা খামে মুড়ে। এই ক-মাসে তিনি ক্রেডিট কার্ডটার অস্তিত্ব প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন।


ফোন রেখে কুবের হাজির হলেন শোবার ঘরে। মনের মধ্যে বুদবুদের মতো হাজারটা কী, কোথায়, কেন-র ওপরে ঘুরছে একটা বড় জিজ্ঞাসা চিহ্ন – কে?

ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করার মতো বদখেয়াল গিন্নির হবে না। তাহলে কি পুলু? তাঁর ছেলে পুলু সবে কলেজে ভরতি হয়েছে। এই বয়সেই ছেলেমেয়েদের বাবার ক্রেডিট কার্ডের মতো নির্ভার পাখনার প্রয়োজন হয়। বাঙ্ক থেকে বাক্সটা চটজলদি নামিয়ে কয়েকটা কাগজ এদিক-ওদিক সরিয়ে খামটা পেয়েও গেলেন। যেভাবে রেখেছিলেন, সেভাবেই সেলোটেপ আঁটা আছে একেবারে। কাঁপা-কাঁপা হাতে খামটা ছিঁড়তেই তার পেট থেকে বেরিয়ে এল একদা তাঁর গলায় ফুটে থাকা হাড় – ‘কুবের সেন’ লেখা প্লাস্টিকের সেই আশ্চর্য চিরাগ। কার্ডটা হাতে নিয়ে বিস্ময়ের চোখে সেটা উলটে-পালটে দেখছেন, হঠাৎ গিন্নি হাজির – “সক্কাল-সক্কাল এই ময়লাগুলো ঘরে না ফেললেই নয়? পঞ্চার মা আজ আসবে না। আমার ঘর মুছতে মুছতে দুপুর হয়ে যাবে। আর কাজ না বাড়িয়ে চান করতে যাও।”

চান করতে করতে কুবের চিন্তায় ডুবে গেলেন। তাঁর ক্রেডিট কার্ড খোওয়া যায়নি। গত চার-পাঁচ মাস ধরে খামবন্দি পড়ে আছে। অথচ ওই কার্ডে তাঁর বকেয়া আঠাশ হাজার টাকা! নিশ্চয় ব্যাঙ্ক থেকে কোনও গন্ডগোল করেছে। আর কারও ক্রেডিট কার্ড বিল তাঁর ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। কুবের ঠিক করলেন এদের কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে কড়কে দেবেন।

হঠাৎ দরজায় গুমগুম ঘুষি – “বাবা, তোমার হল? আমার কলেজ যাওয়া হবে না আজ আর।” পুলুর মুষ্ট্যাঘাতে কুবেরের সম্বিত ফিরল। বাথরুম থেকে বেরিয়ে জামাপ্যান্টে নিজেকে সেঁধিয়ে দিয়ে কোনওরকমে নাকে-মুখে দুটো গুঁজেই ছুটলেন বাস ধরতে।

❤️ 4 💬 2
Read Full Post »
ঢাক পেটানো

খেয়েই সুখ!

@Sharmistha
21 Sep 2026

মধ্যমগ্রাম বাজারে সারাবছর নারকেল পাওয়া যায়। সে আপনি বলতেই পারেন, মধ্যমগ্রাম কেন, আমাদের চন্ডীদাস মার্কেটেও পাওয়া যায়, আসলে আমাদের এখানে যেন নারকেলগুলো ডাকাডাকি করে, ‘আসুন দিদি, আসুন কাকী, নিয়ে যান গোটা দুই, ডালে খান, কচু শাকে খান, মানকচু বাটায় খান, মালাইকারি খান…খান, খান, খান…’; তা দরদাম করে আর সাহস হয়নি। কুড়ি টাকার কচুশাকের জন্য পঞ্চাশটাকার নারকেল? তখন পালা-পার্বণের সময়। নারকেল গাছের মতো নারকেলের দামও আকাশ মুখো, তাই হাতে করে আনা হয়নি। তা পৌষ সংক্রান্তির সময় বাবলি যখন বললো ওর পাড়ায় সস্তায় নারকেল পাওয়া যাচ্ছে তখন আর দেরী করিনি। ফাঁকিবাজ হলেও সুগৃহিনী আমি, বরের পকেটের খেয়াল রাখি। এককথায় আনতে দিলাম পাঁচ খানা। তারপর শুরু হলো এই গল্প।


নারকেল দেখে মনখারাপ হওয়ার যোগাড়! একটা মাত্র সুস্থ স্বাভাবিক, বাকীগুলো অপুষ্টিতে ভুগে ভোগে যাওয়া! কোথায় আমার বাবার বাড়ির গাছের ইয়া বড় বড় ফল, আর কোথায় এই পঞ্চমুষিক! বাবলিকে বললাম, দ্যাখো বাপু, এইরকম গোড়া লেবুর মতো নারকেল এনেছ, এতে আমি একশ টাকার বেশি একপয়সাও দেবনা! সে বেচারী নিজেও অপ্রস্তুত, ভাবেনি খোসা ছাড়াবার পর এমন জিনিস বেরোবে। তারপর সেই নারকেল কিছুদিন গড়াগড়ি খেল মেঝেতে। হপ্তাখানেক পর পুঁচকে একটা ফাটিয়ে মানকচু বাটা খাওয়া হলো। দেখলাম ছোট হলেও মালাই আছে পুরু আর মিষ্টি। ভাবলাম এতটাও হতচ্ছেদ্দা করার কিছু হয়নি, ফন্দি জানলে তিল তিল করে পয়সা জমালে টাকার পাহাড়ও তৈরি করা যায়, নেহাৎ আমার জানা নেই তাই! এদিকে জানুয়ারি মাস পুরো চলে গেল রসরাজের পাটিসাপটা খেয়ে। মধ্যমগ্রামের ‘রসরাজ’ এর পাটিসাপটা যিনি খাননি তাঁর কথা ভাবলেও কষ্ট তাই ভাবছি না, আমি এবং আমরা রীতিমতো লাইন দিয়ে গরম গরম অতীব সুস্বাদু স্বর্গীয় এই সোজাসাপটা বস্তুটি গলধঃকরণ করেছি, দোকান থাকতে বাড়িতে কেন! কে খাটে! তাই যেখানকার নারকেল সেখানেই ছিল বসে। এবার গরম পড়তে শুরু করেছে, ভাবলাম এবার যদি কিছু না করি তাহলে বাকি আশি টাকা জলে যাবে। তাই আজ, একটু আগে নাড়ু বানানোর দুঃসাহস দেখিয়ে ফেলেছিলাম। একটা পচা বেরোলো। মানে কুড়ি টাকা জলে। তারপর বাগড়া দিল গ্রাইন্ডার। যতই ঘোরাই না কেন, নারকেলের টুকরোগুলো আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে যেন বলতে লাগলো, ছোট বলে হেয় করেছিলে না, দ্যাখো কেমন সাজা! দিলাম ঢেলে চিনি। এবার একটু নম্র ভাব দেখা গেল। আবার ঘ্যারররররর্….মিক্স মিক্স মিক্স। ভয়ানক শব্দ। সেটা থামলেই সেক্রেটারী অব স্টেটস এর স্যালারী, পাবলিক সেক্টর, প্রাইভেট সেক্টর ইত্যাদি কঠিন কঠিন জিনিসপত্র পড়ার আওয়াজ। কাল বোধহয় স্কুলে টেস্ট আছে। এরপর দিলাম দুধ ঢেলে, যদি মিহি হয়! তা হলো, বেশ কয়েক ইউনিট বিদ্যুৎ খরচা করে নারকেল মিহি হলো। কড়া চাপলাম। বিশ্বাস করুন তার দু তিন মিনিটের মাথায় মনে হলো, এ আমি কি করলাম! এই ভর সন্ধ্যায় ফোনালাপ না করে নাড়ু পাকাতে বসলাম! তাও আবার রেসিপি না দেখে! কেন! চিনির নাড়ু ঠিকঠাক হওয়া এক দূরহ ব্যাপার, কেন করতে গেলাম। আরো না জানি কতক্ষণ সময় দিতে হবে ভেবেই রান্নাঘরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে ফেললাম। ওদিকে ঘর থেকে আর পড়ার শব্দ আসছে না। পরীক্ষার্থী কি মধুপুরে পৌঁছে গেল? হাঁক দিলাম, ‘কি রে, আওয়াজ পাচ্ছি না কেন?’ শুরু হলো, ‘.....টু প্রমোট সোশ্যাল প্রগ্রেস….' এদিকে গ্যাসের পাশ থেকে সরলেই নারকেলে লালচে ছোপ। নাম্বার কাটা গেল। যে খুন্তি মাখনের নাড়িয়ে মতো ঝোল ঝাল নামিয়ে ফেলি সেই খুন্তি হয়ে গেছে ভারী! বাহুবল যেমন লাগছে, বাহুতেও তেমন লাগছে। ঘাড়ে টনটন, হাঁটুতে কনকন। বুঝলাম দিদা আমার কেমন আরামে বসে রান্না করতো। উঁচু খুর লাগানো পিঁড়ি। মাঝখানে ফুলের নকশা করা। বড়মামা গো! তুমি আমার জন্য একটা পিঁড়িও রাখলে না! যাইহোক, সবকিছুই জীবনের নিয়ম মেনে একসময় ফুরিয়ে যায়, নাড়ুও নেমে গেল। যখন গরম গরম নাড়ু পাকাচ্ছিলাম তখন ভাবছিলাম, এত কিছু বেরোয় বাজারে, ব্যাটারা একখান ছ্যাঁকাপ্রুফ গ্লাভস বানাতে পারেনা! বাংলার ঘরে ঘরে এর আশু প্রয়োজন। ঠিক তেমনই হলো যেমন কলেজে পড়ার সময় মায়ের হাতে হাতে গড়তাম। দু হাতের তালু বেয়ে তেল গড়িয়ে পড়ছিল। শুধু রং টা হলোনা। সাদা ফটফটে রং টা করতে পারলাম না। কেউ জানলে বলবেন। হিংসা করে নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখবেন না। শেয়ারিং ইজ কেয়ারিং। মোট ছত্রিশখানা নাড়ু হয়েছে। আকারে প্রকারে নিজস্বতা বজার রাখতে পেরেছে তারা। কারো সাথে কারো মিল নেই, গায়ের রং ফরসা না হলেও মন্দ নয়, অন্তত বাজারি গুড়ের নাড়ুর মতো কালো কেষ্টি নয়। কি বললেন? ‘ডোন্ট বি রেসিস্ট?’ দেখুন ভাইলোগ, আমি কালী কেষ্টর দেশের মানুষ, আমরা বুক বাজিয়ে কালোকে কালো, ফরসাকে ফ্যাটফ্যাটে বলতে জানি, তবে যেটা করবোনা সেটা হলো, কেউ শর্টকাট পদ্ধতি না বলে দিলে নাড়ু ফাড়ুতে আমি আর নেই। নেভার এভার! এখন যাই, ঘাড়ে একটু ভলিনি স্প্রে না করলে আর চলছে না!


পুনশ্চঃ নাড়ুর ছবি মুছে গেছে। অনেকদিন আগের গল্পটা রয়ে গেছে। পড়ার সময় নাড়ু কল্পনা করে নেওয়া যাবে'খন!

❤️ 4 💬 7
Read Full Post »
রম্য

উল্টো

@saumenbhattacharjee545
21 Sep 2026

#উল্টো


ছোটবেলায় আমি পড়তে বসার সময়ে কেন জানিনা আলোর দিকে পিছন করে বসতাম। পিসিমা বলতেন 'উল্টোপোঁদা' ছেলে। পরে পরেও অনেক উল্টো উল্টো কাজ করেছি। ভেবে দেখেছি আমার স্বভাবটাই উল্টো। প্রায়ই যা করার কথা তার উল্টোটা করে বসি। এতে অনেক উল্টো ফলও হয়। তাতে কী? স্বভাব বদলায় নাকি?


এরকম একটি অভ্যাস উল্টো করে কথা বলা। সেই ছোটবেলায় শোনা কে যেন একটা 'রাম' বলতে পারত না বলে তাকে 'মরা' বলতে বলা হয়েছিল। ত সেই 'মরা মরা' বলতে বলতে সে রাম বলতে শিখে গেল। উল্টো কাজ করলে যে তার ফল সবসময়ই উল্টো হবে তা নয় তালে। যা হোক, আমার এই স্বভাবটি আছে। ছোট থেকে শুরু, কিন্তু আজও এই বুড়োবেলায়ও আছে। 'খাবার' উল্টো করলে হয় 'রবাখা'। কিন্ত না, আমার প্রসেসে বললে সে ' বারখা', অর্থাৎ উচ্চারণ করার সময়ে বার বার এটি বললে মূল শব্দটি পাওয়া যাবে। 'রবাখা' তে যা পাওয়া যাবেনা 'বারখা' তে সেটি পাওয়া যাবে। আপনারা বলে বলে পরখ করতে পারেন।


বেশ কথা। এই উল্টো দুনিয়ায় আমার প্রিয় হল গান। ধরুন গাইলাম 'বনেজী রেযা মিতু ওনিদা লামা'। কিছুই বুঝবেন না। তবে সুর শুনে বুঝবেন 'জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা' গাইছি। আজ্ঞে হ্যাঁ। সুর উল্টো করে অবশ্য গাইতে পারিনা। সে চেষ্টায় আছি। এখন পর্যন্ত 'সারেগামাপাধানিসা-সানিধাপামাগারেসা'র বেশি পারিনি। মানুষ এসব শুনে, দেখে আশ্চর্য হন, স্তম্ভিত হন, আমাকে পাগল ভাবেন। এর মধ্যে আমার স্ত্রী এবং কন্যাও আছেন। কিন্তু ওই। স্বভাব। এমনও হয়েছে যে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে গিয়ে হেঁড়ে গলায় গান ধরেছি 'মারতো খানাই দ্যা এর মারতো খানাই দ্যা' আর পাশে দাঁড়ানো গাড়ির কাচ নামিয়ে কেউ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি সুরটি চিনেছেন। কিন্তু 'তোমার দেখা নাই রে' র জায়গায় যা গাওয়া হচ্ছে তা বুঝতে পারেননি। এ হামেশাই ঘটে। বাড়িতে ত প্রায় রোজই। এই ত আজকেই উচ্চ স্বরে গান ধরেছিলাম' য়সব মারআ খেরমু খায়রে খায়শে জবআ কোণমিতিত্রি', তা গিন্নি তার থেকেও জোর গলায় বললেন "তোর বয়স খালি মুখের রেখায়ই ত্রিকোণমিতি শিখবে নাকি কাজে কর্মেও কিছু বোঝা যাবে?" অগত্যা সঙ্গীত বন্ধ করতে হল। এখানে বলে রাখি, এতদিন ঘর করতে করতে গিন্নি আমার উল্টো স্বভাবটি বুঝে গেছেন এবং আমার উল্টো কথাগুলি ভালই বোঝেন। 


যা বলছিলাম। উল্টো সবসময় যে উল্টো তা নয়। অনেক সময়েই অনেক উল্টো ব্যাপার স্যাপার অনেক কিছু সোজা করে দেয়। ধরা যাক খুব ঝগড়া হচ্ছে। এই সময়ে এক পক্ষ উল্টো পথ ধরে দু পা পিছিয়ে গেলেই ঝগড়া থেমে যায়। সেটাই করে ওঠা মুশকিল। সাইকেল চালাতে চালাতে চেন পড়ে গেলে দুবার উল্টো দিকে প্যাডেল ঘোরালেই চেন আবার স্বস্থানে ফিরে আসে। সময়মত উল্টো কাজটা করতে জানা জরুরি। সেটা সবাই পারেনা। 


উল্টোর দিনকাল নতুন নয়। কারা যেন মাঝে আওয়াজ তুলেছিলেন 'উল্টে দেখুন পাল্টে গেছে'। তাতে অবশ্য ভাল হয়েছিল না মন্দ তা বলতে পারিনা। রায় মশায়ের বুড়ো বলেছিল বয়স নাকি চল্লিশের পর আবার উল্টো দিকে গুনতি শুরু করে। ভাবুন দেখি কী 'তিকসাংঘা' ব্যাপার! এই দেখুন আপনিও এখন অল্প অল্প উল্টো কথা বুঝতে পারছেন। 


যা হোক, উল্টো সবসময়ে ভাল না। যাকে 'থ্যাঙ্ক ইউ' বলার কথা তাকে 'স্ক্রু ইউ' বলে দেওয়াটা কোনো কাজের কথা নয়। তেমনি চিরকাল আপনি ভাল মানুষ হয়ে থাকলেন, আর লোকে ভাবল ওই ভালমানুষি আসলে ভালমানুষি নয়, ওটা আপনার দুর্বলতা, সেটাও কোনো কাজের কথা নয়। সময়ে সময়ে উল্টো খেলুন। সবসময় নয়। উল্টে কথা বলুন, উল্টে গেঞ্জি পরুন ঠিক আছে। কিন্তু রাস্তার উল্টো দিকে গাড়ি চালাবেননা। সুন্দরী মহিলা দেখলে, যাকে দেখে একটু ইয়ে ইয়ে হল, তার গোড়ালি উল্টো দিকে কিনা তা অবশ্যই দেখে নেবেন। না হলে চাপ হতে পারে। 


যাক, আজ আর বাজে বকবনা। 

'বাইস লভা বেনথাক'।

❤️ 4 💬 8
Read Full Post »
User Name